আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর সংক্ষিপ্ত জীবনী।

হযরত আবু বকর (রাঃ) এর ব্যক্তিগত নাম ছিল আব্দুল্লাহ, কিন্তু আরবের প্রথামত তিনি তাঁর ছেলের নাম বকর থেকে আবু বকর (বকরের পিতা) নামে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আবু কোহাফা এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল উম্মুল খাইর সালমা। তিনি ৫৭২ খ্রীস্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহানবী (সাঃ) এর একজন ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন। তিনিই পুরুষদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি যিনি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দাবীর সত্যতাকে নিশ্চিত বলে গ্রহণ করেন এবং এভাবে ‘সিদ্দীক’ উপাধি লাভ করেন। তিনি মহানবী (সাঃ) এর মক্কা থেকে মদীনা হিজরতের সময় তাঁর সহযাত্রী ছিলেন। তিনিই হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর একমাত্র সাহাবী, যিনি তাঁর সাথে সেই সফরে ‘সাওর’ গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
অন্যান্য আরব শিশুদের মতো আবু বকর তার বাল্যকাল অতীবাহিত করেন। দশ বছর বয়সে তিনি তার বাবার সাথে একটি বাণিজ্য কাফেলায় করে সিরিয়া যান। পরে তিনি বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তিনি সিরিয়া, ইয়েমেন প্রভৃতি স্থানে সফর করেছেন। এসব সফরের ফলে তিনি ধনী ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হয়ে উঠেন। তার পিতা বেঁচে থাকলেও আবু বকর গোত্রের প্রধান হিসেবে সম্মান পেতে থাকেন।
আবু বকর শিক্ষিত ছিলেন এবং কাব্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তার স্মৃতিশক্তি ভালো ছিল এবং আরব গোত্রসমূহের বংশলতিকা নিয়ে পাণ্ডিত্য ছিল।
নবীজি (সা.) এর সঙ্গে সম্পর্ক:
হজরত আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বয়সে দুবছর ছোট ছিলেন। তিনি ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ১৮ বছর বয়সে নবীজি (সা.) এর বন্ধু হওয়ার অমূল্য দৌলত অর্জন করেন। তিনি তৎকালীন সময়ে মক্কার নেতৃস্থানীয়দের একজন ছিলেন। নবীজি (সা.)-এর বয়স তখন ২০ বছর ছিল। এটিই ছিল তাঁদের পরস্পর বন্ধুত্বের সূত্রপাত। যা পরবর্তী সময়ে এমন গভীরতা লাভ করে যে তার নিদর্শন দুনিয়ায় বিরল। এবং তিনি ১৮ বছর বয়স থেকে ৬১ বছর পর্যন্ত জীবনের এ ৪৩টি বছরে নবীজি (সা.)-এর নবুওতয়াতের স্বাদ ও সৌন্দর্য খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন।
হিজ্জ্বাতুল বিদা (বিদায় হজ্ব) এর পরে, যখন মহানবী (সাঃ) গুরুতরভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন, তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ) কে দৈনন্দিন নামাযে ইমামতী করার নির্দেশ দেন। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর শোকাবহ ইন্তেকালের পর, হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। তাঁকে মহানবী (সাঃ)-এর আকস্মিক মৃত্যুতে উদ্ভূত একটি অত্যন্ত সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতির সামাল দিতে হয়।
তাঁর খিলাফতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের একটি হলো পবিত্র কুরআনকে একস্থানে সংগৃহিত করা। যদিও মহানবী (সাঃ) স্বয়ং পবিত্র কুরআনের লিখন ও বিন্যস্তকরণ কাজ সুসম্পন্ন করেছিলেন,কিন্তু তখন পর্যন্ত তা বিবিধ চামড়ার টুকরা, বৃক্ষ পত্ররাজি এবং পাথরের ফালিতে লিখিত ছিল। হযরত আবু বকর (রাঃ) এই সকল বিছিন্নভাবে লিখিত অংশকে সংগ্রহ করে একত্রিত করেন এবং কুরআন সংরক্ষণের নিমিত্তে হিফযকারীদের ব্যবস্থাপনাকে পদ্ধতিগত ভাবে পূনর্বিন্যস্ত করেন।
অবদান
আবু বকরের খিলাফতকাল দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শাসন করলেও এসময়ে তিনি ইসলামত্যাগীদের দমন, সাসানীয় ও বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের মতো সফলতা অর্জন করেন। আবু বকরকে সাহাবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা হয়।
প্রথম খলিফা হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে আবু বকরের আলাদা স্থান রয়েছে। তিনি একমাত্র খলিফা যিনি মৃত্যুর সময় সরকারি কোষাগারে তার ভাতার অর্থ পরিমাণ পরিশোধ করেছিলেন।[২৩] বাইতুল মাল নামক সরকারি কোষাগারের তিনি প্রতিষ্ঠাতা।
ইসলামগ্রহণের পূর্বেও আবু বকর মদ পান করতেন না। কুরাইশ বংশে বংশলতিকা বিষয়ে তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল।
হযরত আবু বকর (রাঃ) পক্ষকাল অসুস্থ্য থাকার পর ৬৩৪ খ্রীস্টাব্দের ২৩ অগাস্ট পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন সেই দশ আশীর্বাদপুষ্টদের একজন যাঁদেরকে মহানবী (সাঃ) সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে তাঁদের জান্নাতে ভূষিত করা হবে। তিনি দু’বছরের কিছু অধিককাল খিলাফতের মসনদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

0 Comments